গান
ই-ব-২স২
আসুন গান-বাজনা থেকে
তাওবা করি ()
আলী
হাসান তৈয়ব
ইসলামে
গান-বাজনা হারাম হলেও এ ব্যাপারে কিছু বিজ্ঞজনের ভিন্ন মত অনেককেই বিভ্রান্ত করে।
আজকাল এই গান-বাজনার রমরমার যুগে অনেক মোটামুটি দীনদার লোকও এ ফিতনায় পতিত হন।
তারা বিষয়টাকে এতোটা গুরুতর ভাবেন না। এসব ভাইয়ের সামনে বিষয়টির গুরুত্ব তুলে
ধরতেই এ লেখা।
আসুন গান-বাজনা থেকে
তাওবা করি
[ বাংলা
– Bengali – بنغالي ]
আলী হাসান তৈয়ব
সম্পাদনা : ড. মোহাম্মদ
মানজুরে ইলাহী
2011-1432
﴿ تعالوا نتوب من الغناء والموسيقى ﴾
« باللغة البنغالية »
علي حسن طيب
مراجعة: الدكتور محمد منظور إلهي
2011-1432
আসুন গান-বাজনা থেকে
তাওবা করি
প্রকৃতির ধর্ম ইসলাম
মানুষের স্বভাব ও প্রকৃতির সুস্থতার স্বার্থেই গান-বাজনাকে নিষিদ্ধ করেছে।
গান-বাজনা যেমন আমাদের পরকাল ভুলিয়ে দেয় তেমনি বস্তুজগতকেও দেয় ডুবিয়ে। এ গানের
মাধ্যমেই দুর্বল নৈতিকতসম্পন্ন লোকেরা বিশেষত তরুণ প্রজন্ম অবৈধ প্রেম ও লৌকিক
ভালোবাসার প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়। আর এ প্রেম-ভালোবাসার প্রসাদ খেতে গিয়েই করতে বাধ্য
হয় অনেক অপরাধ। পছন্দের মেয়েকে ভালোবাসতে না পারলে তখনই নীতিহীন ও আল্লাহভোলা
ছেলেরা ঘটাতে থাকে ধর্ষণ, গুম,
এসিডে মুখ ঝলসানোসহ নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। আর তা যদি হয় পরকীয়া,
তবে এরই সূত্রে ঘটে স্ত্রী কর্তৃক স্বামী খুন এমনকি রাক্ষুসী
মায়ের হাতে নিষ্পাপ শিশুকে পর্যন্ত হত্যার ঘটনা।
অনেকের ধারণা, দুঃখের সময় গান শুনলে বেদনা লাঘব হয়। আসলে গান
কখনো মনের বেদনা লাঘব করে না। বরং তাকে চাগিয়ে দেয়। এবং না পাওয়ার হতাশায় ভেতরে
হাহাকার তোলে। ভুলে যাওয়া মন্দ অতীতকে স্মরণ করে দিয়ে ব্যাথাতুর ও ভগ্ন হৃদয়
বানায়। যারা লৌকিক প্রেম ও ভালোবাসায় আকণ্ঠ ডুবে আছে তাদের আরও উৎসাহিত করে আর
যারা এখনো এ জগতে পা রাখে নি, এ পথে তাদের অভিষেক ঘটায়।
শুধু এতটুকু হলে তাও হতো। গান-বাজনার ভূমিকা এ পর্যন্ত সীমাবন্ধ নয়। যারা এ
গান-বাজনায় পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে যায়, তাদের কাছে পবিত্র
কুরআনের মোহনীয় তিলাওয়াত কিংবা হৃদয়ছোঁয়া সুরে সুন্দর জীবনের প্রতি আহ্বানকারী
ইসলামী সঙ্গীতও ভালো লাগে না। বিশ্বাস না হলে আপনি পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। যারা
সবসময় আমাদের সমাজটাকে রসাতলের পথে নেয়া গান-বাজনা ও মিউজিকে অভ্যস্ত তাদের সামনে
ইসলামী সঙ্গীত বা কোনো বিখ্যাত কারীর তিলাওয়াত বাজিয়ে দেখুন। দেখবেন এগুলো তাদের
টানবে না। তাদের ভেতরে কোনো প্রতিক্রিয়াই সৃষ্ট করবে না। (আল্লাহ আমাদের হিফাযত করুন।)
দুঃখজনক সত্য হলো, আজকাল এই গান-বাজনা আমাদের সমাজকে এতো গভীরভাবে
গ্রাস করেছে যে, অনেকেই জ্ঞাতে অজ্ঞাতে কুরআন ও হাদীসের
নানা ফাঁক-ফোকর খোঁজার ব্যর্থ কৌশল গ্রহণ করে কিংবা মতলবী ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়ে
সমাজবিধ্বংসী এসব গান-বাজনার বৈধতা দেবার প্রয়াস পান। এদিকে যারা ইসলামের কিছুই মানতে
রাজি নয় কিংবা একেবারে খোলা মন সাধারণ মুসলিম, তারা এ
থেকে হন বিভ্রান্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত। এমনই এক বিভ্রান্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত বোনের সন্ধান
মেলে ফেসবুকে। একেবারে অজানা অদেখা এ মুসলিম বোনের পুরাতন ফেসবুক স্ট্যাটাসগুলো
ঘেঁটে মনে হলো তিনি বড় দীন দরদী। বরাবর কাতর তিনি অন্যের হেদায়েত কামনায়।
একদিন তাঁর একটি
স্ট্যাটাস দেখতে পেলাম ইসলামে মিউজিক বিষয়ে। একটি ব্লগে পোস্ট করা প্রাচ্যবাদে
প্রভাবিত এক ব্যক্তির এ বিষয়ে লেখা একটি ইংরেজি নিবন্ধ বোধ হয় তাঁকে বেশ প্রভাবিত
করেছে। অনেক ইনিয়ে-বিনিয়ে এ নিবন্ধে মিউজিকের খানিকটা সাফাই গাওয়া হয়েছে। বোনটি
ফেসবুকে ওই লেখাটির লিংক দিয়েছেন দেখে ভাবলাম এ লেখাতো তাঁর মতো আরও অনেককেই
প্রভাবিত করতে পারে। ইসলামে নিষিদ্ধ একটি বিষয়ে নমনীয় করতে পারে। তাই তাঁকে ইসলাম
হাউজে দেয়া এ সংক্রান্ত বেশ কিছু লেখার লিংক দিলাম। যাতে তাঁর বিভ্রান্তির ঘোর কেটে
যায় এবং সবার সামনে বাস্তবতা পরিষ্কার ফুটে ওঠে। আমার কমেন্টের জবাবে তিনি যা
বললেন, তাতে মনে হলো ইংরেজি ওই লেখার
অগভীর যুক্তিগুলো সহসা তিনি উপেক্ষা করতে পারছেন না। এটি একটি কনফিউশনের বিষয় বলে
তিনি ইসলাম হাউজের লেখাগুলো উপেক্ষা করতে চাইছেন বলে আমার মনে হলো।
সত্যি কথা বলতে কী, এ তো কোনো কনফিউশনের বিষয়ই নয়। গান-বাদ্য তো কোনো
অস্পষ্ট বা ধোঁয়াশাচ্ছন্ন বিষয় নয়। পৃথিবীর সব আলেমই গান-বাদ্যকে হারাম বলেছেন।
হাতে গোনা কয়েকজন এটাকে বৈধ বলতে চেয়েছেন অস্পষ্ট বা ব্যতিক্রমী কিছু প্রমাণের
আলোকে। তাঁদের লেখা পড়ে শুধু তারাই দ্বিধায় পড়ি, আমরা
যারা এটাকে বৈধ হিসেবে দেখতে চাই। আমাদের ঈমানের মজবুত ভিত গড়ে না ওঠায়ই এমনটি
হচ্ছে। নয়তো না ভেবেই আমরা বলে দিতে পারতাম, পৃথিবীর সব
আলেম যেখানে বিষয়টিতে একমত, সেখানে দুয়েকজনের ব্যতিক্রমী
বক্তব্য গ্রহণ করার তো কোনো প্রয়োজন নেই। এ গেল যুক্তির কথা। এবার চলুন আল্লাহ ও
তাঁর রাসূল আমাদের কী বলেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শিক্ষা কী। আমরা কি সবার কথা
গ্রহণ করবো? নাকি আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের অনুসরণ করবো?
মহান আল্লাহ বলেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَأُوْلِي ٱلۡأَمۡرِ مِنكُمۡۖ فَإِن تَنَٰزَعۡتُمۡ فِي شَيۡءٖ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۚ ذَٰلِكَ خَيۡرٞ وَأَحۡسَنُ تَأۡوِيلًا﴾ [النساء :59]
‘হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে
কর্তৃত্বের অধিকারীদের। অতঃপর কোনো বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও
রাসূলের দিকে প্রত্যার্পণ করাও- যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি
উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর।’ {সূরা
আন-নিসা, আয়াত : ৫৯} অপর এক আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۖ إِنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلۡعِقَابِ﴾ [الحشر: 7]
‘রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ
কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং
আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর।’ {সূরা আল-হাশর, আয়াত : ০৭}
আল্লাহ ও রাসূলের কথা
শোনার পরও যদি আমরা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেই, তা মানার ক্ষেত্রে টালবাহানা করে করি, তবে তার
চেয়ে মন্দ আর কি হতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَلَا تَوَلَّوۡاْ عَنۡهُ وَأَنتُمۡ تَسۡمَعُونَ ٢٠ وَلَا تَكُونُواْ كَٱلَّذِينَ قَالُواْ سَمِعۡنَا وَهُمۡ لَا يَسۡمَعُونَ ٢١﴾ [الأنفال: ٢٠، ٢١]
‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও
না, অথচ তোমরা শুনছ। আর তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা বলে আমরা শুনেছি অথচ তারা শুনে না।’ {সূরা আল-আনফাল, আয়াত
: ২০-২১}
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়
হলো আজ আমরা কালেমা পড়ি, সপ্তাহে
একবার অন্তত মসজিদে গিয়েও হাজিরা দেই; কিন্তু আল্লাহ ও
রাসূলের নির্দেশ, বিধান ও বিচার আমাদের কাছে তেমন গুরুত্ব
পায় না। আমাদের কাছে অন্য কিছু আর ভিন্ন যুক্তিই গ্রহণযোগ্য মনে হয়! আমাদের সতর্ক
হওয়ার জন্য নিচের আয়াতগুলোই তো যথেষ্ট হওয়া উচিত। মহান আল্লাহ বলছেন,
﴿فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا﴾ [النساء: 6]
‘অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে
তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে
সে ব্যাপারে নিজদের অন্তরে কোনো দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়’। {সূরা নিসা : ৬৫}
অন্যত্র তিনি বলেন,
﴿أَلَمۡ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ يَزۡعُمُونَ أَنَّهُمۡ ءَامَنُواْ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡكَ وَمَآ أُنزِلَ مِن قَبۡلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوٓاْ إِلَى ٱلطَّٰغُوتِ وَقَدۡ أُمِرُوٓاْ أَن يَكۡفُرُواْ بِهِۦۖ وَيُرِيدُ ٱلشَّيۡطَٰنُ أَن يُضِلَّهُمۡ ضَلَٰلَۢا بَعِيدٗا ٦٠ وَإِذَا قِيلَ لَهُمۡ تَعَالَوۡاْ إِلَىٰ مَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ وَإِلَى ٱلرَّسُولِ رَأَيۡتَ ٱلۡمُنَٰفِقِينَ يَصُدُّونَ عَنكَ صُدُودٗا ٦١ فَكَيۡفَ إِذَآ أَصَٰبَتۡهُم مُّصِيبَةُۢ بِمَا قَدَّمَتۡ أَيۡدِيهِمۡ ثُمَّ جَآءُوكَ يَحۡلِفُونَ بِٱللَّهِ إِنۡ أَرَدۡنَآ إِلَّآ إِحۡسَٰنٗا وَتَوۡفِيقًا ٦٢﴾ [النساء: ٦٠- ٦٢]
‘তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা দাবী করে যে, নিশ্চয় তারা ঈমান এনেছে তার
উপর, যা নাযিল করা হয়েছে তোমার প্রতি এবং যা নাযিল করা
হয়েছে তোমার পূর্বে। তারা তাগূতের কাছে বিচার নিয়ে যেতে চায় অথচ তাদেরকে নির্দেশ
দেয়া হয়েছে তাকে অস্বীকার করতে। আর শয়তান চায় তাদেরকে ঘোর বিভ্রান্তিতে বিভ্রান্ত
করতে। আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘তোমরা আস যা আল্লাহ নাযিল
করেছেন তার দিকে এবং রাসূলের দিকে’, তখন মুনাফিকদেরকে
দেখবে তোমার কাছ থেকে সম্পূর্ণরূপে ফিরে যাচ্ছে। সুতরাং তখন কেমন হবে, যখন তাদের উপর কোন মুসীবত আসবে, সেই কারণে যা
তাদের হাত পূর্বেই প্রেরণ করেছে? তারপর তারা আল্লাহর নামে
শপথ করা অবস্থায় তোমার কাছে আসবে যে, আমরা কল্যাণ ও সম্প্রীতি
ভিন্ন অন্য কিছু চাইনি।’ {সূরা আন-নিসা, আয়াত : ৬০-৬২}
আল্লাহ তা‘আলার বিধান নিয়ে সমালোচনা করার সময় একজন মুসলিম
কীভাবে ভুলে যায় যে সে আল্লাহর নির্দেশাবলির মধ্যে কোনো কিছু নির্বাচন-বর্জনের
অধিকার রাখে না। তার অধিকার নেই কোনোটাকে গ্রহণ আর কোনোটাকে বর্জন করার। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿أَفَتُؤۡمِنُونَ بِبَعۡضِ ٱلۡكِتَٰبِ وَتَكۡفُرُونَ بِبَعۡضٖۚ فَمَا جَزَآءُ مَن يَفۡعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمۡ إِلَّا خِزۡيٞ فِي ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَاۖ وَيَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰٓ أَشَدِّ ٱلۡعَذَابِۗ وَمَا ٱللَّهُ بِغَٰفِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُونَ ٨٥ أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ ٱشۡتَرَوُاْ ٱلۡحَيَوٰةَ ٱلدُّنۡيَا بِٱلۡأٓخِرَةِۖ فَلَا يُخَفَّفُ عَنۡهُمُ ٱلۡعَذَابُ وَلَا هُمۡ يُنصَرُونَ ٨٦﴾ [البقرة: ٨٥، ٨٦]
‘তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে
ঈমান রাখ আর কিছু অংশ অস্বীকার কর? সুতরাং তোমাদের মধ্যে
যারা তা করে দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ছাড়া তাদের কী প্রতিদান হতে পারে? আর কিয়ামতের দিনে তাদেরকে কঠিনতম আযাবে নিক্ষেপ করা হবে। আর তোমরা যা
কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন’। {সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ৮৫}
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে
আমাদের সামনে সুস্পষ্ট প্রতিভাত হয়, ঈমানের দাবী হলো, যুক্তির পেছনে না পড়ে কিংবা
কোনো ব্যক্তি স্বার্থের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের
আনুগত্যে সাড়া দেয়া। আর এর দাবী হলো, কোনো দ্বিধায় না
জড়িয়ে অবৈধ গান-বাজনা থেকে তাওবা করা। দুনিয়ার লৌকিক আকর্ষণের মোহে না পড়ে ঈমানের
চিরন্তন স্বাদ গ্রহণে সচেষ্ট হওয়া। সব অজুহাত দু পায়ে ঠেলে কেবল আল্লাহ ও তাঁর
রাসূলের আনুগত্যেই নিজের সুখ ও শান্তি খোঁজা। গান-বাজনার অবৈধতার প্রশ্নে আসলেই কি
কোনো কনফিউশন বা সংশয়ের অবকাশ আছে? না, নেই। দেখুন ১৪ শতাব্দীকাল আগে এমন সব ব্যাপারে কত সুন্দর সমাধান ও নির্দেশনা
আমাদের দিয়েছেন আল্লাহর হাবীব।
নুমান ইবন বশীর
রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি ইরশাদ করেন,
«الْحَلاَلُ بَيِّنٌ وَالْحَرَامُ بَيِّنٌ وَبَيْنَهُمَا مُشَبَّهَاتٌ لاَ يَعْلَمُهَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ فَمَنِ اتَّقَى الْمُشَبَّهَاتِ اسْتَبْرَأَ لِدِيِنِهِ وَعِرْضِهِ ، وَمَنْ وَقَعَ فِي الشُّبُهَاتِ كَرَاعٍ يَرْعَى حَوْلَ الْحِمَى يُوشِكُ أَنْ يُوَاقِعَهُ أَلاَ وَإِنَّ لِكُلِّ مَلِكٍ حِمًى أَلاَ إِنَّ حِمَى اللهِ فِي أَرْضِهِ مَحَارِمُهُ أَلاَ وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ أَلاَ وَهِيَ الْقَلْبُ ».
‘হালাল স্পষ্ট, হারামও স্পষ্ট। আর এ দু’টির মাঝে রয়েছে
সন্দেহজনক বিষয়সমূহ যা অধিকাংশ লোকই জানে না। সুতরাং যে নিজেকে সন্দেহজনক বিষয়
থেকে বাঁচিয়ে চলে, সে তার দ্বীন ও সম্মানের সংরক্ষণ করে।
আর যে সন্দেহজনক বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে, তার উদাহরণ হচ্ছে সেই
রাখালের মত যে তার মেষপাল চরায় কোনো সংরক্ষিত চারণভূমির কাছাকাছি এমনভাবে যে,
যে কোনো মুহূর্তে সে তাতে প্রবেশ করবে। (হে লোকসকল,) সাবধান! প্রত্যেক বাদশাহরই একটি সংরক্ষিত সীমানা
আছে এবং আল্লাহর যমীনে তাঁর সংরক্ষিত সীমানা হচ্ছে তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ। সাবধান!
শরীরে এমন একটি মাংস পিণ্ড রয়েছে যা সুস্থ (পরিশুদ্ধ) থাকলে সারা শরীর সুস্থ থাকে, কিন্তু যদি তা কলুষিত হয়ে যায় সারা শরীর কলুষিত হয় এবং সেটি হচ্ছে
হৃদয়।’ [বুখারী : ৫২; মুসলিম :
৪১৭৮]
এটা কোনো গোপন বিষয় নয়।
এমন কিছু নয় যা অল্প কিছু মানুষ জানে কিংবা বিশেষ অধিবেশনে অথবা খাস জমায়েতে শুধু
তা জানানো হয়েছে। যেমন আবূ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ وَنَحْنُ نَذْكُرُ الْفَقْرَ وَنَتَخَوَّفُهُ ، فَقَالَ : آلْفَقْرَ تَخَافُونَ ؟ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِه ، لَتُصَبَّنَّ عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا صَبًّا ، حَتَّى لاَ يُزِيغَ قَلْبَ أَحَدِكُمْ إِزَاغَةً إِلاَّ هِيَهْ ، وَايْمُ اللهِ ، لَقَدْ تَرَكْتُكُمْ عَلَى مِثْلِ الْبَيْضَاءِ ، لَيْلُهَا وَنَهَارُهَا سَوَاءٌ. قَالَ أَبُو الدَّرْدَاءِ : صَدَقَ وَاللَّهِ رَسُولُ اللهِ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ , تَرَكَنَا وَاللَّهِ عَلَى مِثْلِ الْبَيْضَاءِ ، لَيْلُهَا وَنَهَارُهَا سَوَاءٌ.
‘আমাদের সামনে রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবির্ভুত হলেন, তখন আমরা
দারিদ্র এবং এ নিয়ে আমাদের শংকা নিয়ে আলাপ করছিলাম। তিনি বললেন, ‘তোমরা দারিদ্রকে ভয় পাচ্ছো? শপথ সেই সত্তার
যার হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের ওপর প্রবলভাবে দুনিয়াকে
ঢেলে দেওয়া হবে এমনকি তোমাদের কারও অন্তর কেবল শুধু সেদিকেই ঝুঁকবে। আল্লাহর শপথ,
‘আমি তোমাদের রেখে যাচ্ছি পরিষ্কার সাদা সমতলে, যার দিন তার রাত্রির মতই।’
আবূ দারদা রাদিয়াল্লাহু
তাআলা আনহু বলেন, আল্লাহর
শপথ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যিই
আমাদের পরিষ্কার সাদা সমতলে রেখে যান, যার দিন তার
রাত্রির মতই। [ইবন মাজা : ০৬; মুসনাদ
বাযযার : ৪১৪১]
অন্যত্র রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
قَدْ تَرَكْتُكُمْ عَلَى الْبَيْضَاءِ لَيْلُهَا كَنَهَارِهَا ، لاَ يَزِيغُ عَنْهَا بَعْدِي إِلاَّ هَالِكٌ ، فَمَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ فَسَيَرَى اخْتِلاَفًا كَثِيرًا ، فَعَلَيْكُمْ بِمَا عَرَفْتُمْ مِنْ سُنَّتِي ، وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ ، عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ ،
‘আমি তোমাদের রেখে যাচ্ছি
পরিষ্কার সাদা সমতলে, যার দিন তার রাত্রির মতই। তা থেকে
কেউ বিচ্যুত হবে না; একমাত্র ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া।
অতএব আমার পরে যে বেঁচে থাকবে, অনেক বেশি মতবিরোধ দেখতে
পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নতের এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খলীফাদের আকড়ে ধরবে। মাড়ির দাঁত
দিয়ে তা আকড়ে থাকবে।’ [ইবন মাজা : ৪৩; মুসনাদ
আহমদ : ১৭১৮২]
রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন বক্তব্য জানার পর আমি মনে করি একটি মিমাংসিত বিষয় নিয়ে
দ্বিধান্বিত হবার কিছু নেই। ব্যতিক্রমী বক্তব্য সন্দেহমুক্ত নয়। পক্ষান্তরে
গান-বাদ্যের ব্যাপারে সবার বক্তব্য সুস্পষ্ট। হ্যা, যেসব গানে অশ্লীল বক্তব্য নেই, মন্দের প্রতি আহ্বানও নেই আর অতি অবশ্যই তাতে বাদ্যও নেই- সেসব তো
ইসলামে অবৈধ নয়। তাই এসবের ওপর ভিত্তি করে আমাদের সমাজে প্রচলিত চরিত্র বিধ্বংসী
গান-বাদ্যের সপক্ষে যাবার কোনো সুযোগ নেই।
আমরা নিজেরাই একটু ভেবে
দেখতে পারি, আমাদের
গান শুনতে ভালো লাগে নাকি কুরআনের তিলাওয়াত? গানের প্রতি
আমাদের মনোযোগ বেশি নাকি তিলাওয়াতের প্রতি? সত্যি বললে, গানের প্রতিই। গান মানুষকে আল্লাহর যিকির ও তাঁর ফিকির থেকে গাফেল
করে বলেই একে হারাম করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে :
﴿ وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَشۡتَرِي لَهۡوَ ٱلۡحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ بِغَيۡرِ عِلۡمٖ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًاۚ أُوْلَٰٓئِكَ لَهُمۡ عَذَابٞ مُّهِينٞ ٦ وَإِذَا تُتۡلَىٰ عَلَيۡهِ ءَايَٰتُنَا وَلَّىٰ مُسۡتَكۡبِرٗا كَأَن لَّمۡ يَسۡمَعۡهَا كَأَنَّ فِيٓ أُذُنَيۡهِ وَقۡرٗاۖ فَبَشِّرۡهُ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ ٧﴾ [لقمان: ٦، ٧]
‘আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ
না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে,
আর তারা ঐগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আযাব।’ {সূরা লুকমান, আয়াত : ০৬-০৭}
যারা মুসলিম উম্মাহর সবার
ঐক্যমত্যের বাইরে গিয়ে গান-বাদ্যকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করছেন, আল্লাহ তাদের মাফ করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের ব্যাপারে আমাদেরকে চৌদ্দশ বছর আগেই সতর্ক করেছেন। তিনি
বলেন,
«لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّونَ الْحِرَ وَالْحَرِيرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ».
‘আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু
লোক সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশম,
মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল সাব্যস্ত করবে।’ [সহীহ বুখারী : ৫৫৯০]
আশা
করি এ উদ্ধৃতিগুলো অধ্যয়ন ও অনুধাবন করার পর কেউ আর গান-বাজনার পেছনে পড়বেন না। অবৈধ
গান-বাজনা আমাদের পরিহার করতেই হবে। অতীতের শোনা গানগুলোর জন্য এবং ভবিষ্যতে এ
থেকে বেঁচে থাকতে তাওবা করতে হবে। আল্লাহ চান তো এ কথাগুলো ফেসবুকের ওই বোনের মতো
আপনাকে আমাকে কনফিউশন মুক্ত করবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর দীন সম্পর্কে সঠিক
বুঝ দান করুন। আমাদের সবাইকে অবৈধ গান-বাজনা থেকে দূরে থাকার তাওফীক দিন। আমীন।
গান-বাজনা ও হারাম জিনিসের
আয়োজন ব্যতীত মীলাদুন্নবী উদযাপন
অনুবাদ:
সানাউল্লাহ নজির আহমদ
সম্পাদনা:
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
12
/ 3 / 1432 , 16/2/2011
বর্ণনা
ফতোয়া
প্রদানকারী এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, মীলাদুন্নবী অনুরূপ অন্যান্য বিদআতি অনুষ্ঠানসমূহকে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের
বন্ধন সুদৃঢ় করা, নতুন প্রজন্মের মাঝে পরস্পর সম্পর্ক সৃষ্টি
করা, দ্বীনের প্রতি তাদের গর্ব ও আত্মসম্মান বৃদ্ধি করা এবং
সন্তানদের চরিত্র ও আচরণের উপর প্রভাব সৃষ্টিকারী বিধর্মীদের মনগড়া উৎসব যেমন ভালবাসা
দিবস ইত্যাদি থেকে সুরক্ষার উদ্দেশ্যে মীলাদুন্নবী উদ্যাপন করা বিদআত ও হারাম।
গান-বাজনা
ও হারাম জিনিসের আয়োজন ব্যতীত মীলাদুন্নবী উদযাপন
উত্তর:
আল-হামদুলিল্লাহ
তৃতীয়ত:
সুন্নতের কতক সত্যিকার ভক্ত নিজ দেশের এসব অনুষ্ঠান দেখে প্রভাবিত হয়,
তারা এসব বিদ'আত থেকে নিজেদের সুরক্ষার জন্য
পরিবার নিয়ে জমায়েত হয়, বিশেষ খাবারের আয়োজন করে এবং সবাই
মিলে খায়। একই উদ্দেশ্যে কেউ বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের একত্র করে, কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন চরিত আলোচনা অথবা
দীনি বক্তৃতা উপস্থাপনের জন্য লোকদের একত্র করে।
সন্দেহ
নেই এর উদ্দেশ্য আপনাদের ভালো, যেমন পরস্পরের
মাঝে ঐক্য তৈরি, অমুসলিমপ্রধান ও কুফুরী দেশে ইসলামি মূল্যবোধ
সৃষ্টি করা ইত্যাদি।
এক.
ইমাম আবু হাফস তাজুদ্দিন আল-ফাকেহানী রহ. মিলাদের বিভিন্ন প্রকার সম্পর্কে বলেন: “কোনো ব্যক্তির নিজ অর্থায়নে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব
ও সন্তানদের জন্য মাহফিলের আয়োজন করা, শুধু পানাহারের মধ্যে
সীমাবদ্ধ থাকা এবং পাপের কোনো সুযোগ না রাখা, এসব অনুষ্ঠানকেই
আমরা বিদ'আত, ঘৃণিত ও মাকরূহ বলছি।
কারণ, এ ধরণের অনুষ্ঠান আমাদের কোনো মনীষী করেন নি,
যারা ছিল ইসলামের পণ্ডিত, যুগ শ্রেষ্ঠ আলেম,
যুগের আলোকবর্তিকা ও জগতবাসীর উজ্জ্বল নক্ষত্র।" (দেখুন: 'আল-মাওরেদ ফি আমালিল মাওলিদ' পৃষ্ঠা: ৫)
দুই.
ইবনুল হাজ আল-মালেকী রহ. গান-বাজনা ও নারী-পুরুষের সহাবস্থান মুক্ত ঈদে মীলাদুন্নবী
সম্পর্কে বলেন: “ঈদে মীলাদুন্নবী যদি
এসব পাপাচার মুক্ত শুধু খানার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে উদযাপন করা হয় এবং তাতে বন্ধু-বান্ধবদের
আহ্বান করা হয়, তাহলেও শুধু নিয়তের কারণে এ অনুষ্ঠান বিদ'আত হিসেবে গণ্য হবে। কারণ, এটা দীনের মধ্যে সংযোজনের
শামিল, পূর্বসূরিদের আমল বিরোধী এবং তাদের নিয়ত ও কর্মের বিপরীত।
আমাদের তুলনায় তাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য,
সম্মান ও মহব্বত বেশি ছিল। দীনি বিষয়ে তারা ছিলেন আমাদের চেয়ে অগ্রগামী।
তাদের কেউ মীলাদের নিয়ত করেন নি। আমরা তাদের অনুসারী, অতএব
তাদের জন্য যা যথেষ্ট, আমাদের জন্যও তাই যথেষ্ট। মৌলিক ও পূর্বাপর
সকল বিষয়েই তারা আমাদের আদর্শ ও পথিকৃৎ। ইমাম আবু তালেব আল-মাক্কী রহ. তার কিতাবে অনুরূপই
বলেছেন"। (দেখুন: আল-মাদখাল ২/১০)
গান-বাজনা
ও হারাম জিনিসের আয়োজন ব্যতীত মীলাদুন্নবী উদযাপন
حكم الاحتفال بذكرى مولد الرسول صلى الله عليه وسلم من
غير غناء ولا محرمات
প্রশ্ন:
আমরা স্পেনবাসী, আমরা সভা সমাবেশকে
একতা, ভ্রাতৃত্ব বন্ধন, নতুন প্রজন্মের
মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টি, দ্বীনের প্রতি তাদের গর্ব ও আত্মসম্মান
বৃদ্ধি এবং আমাদের প্রজন্মের চরিত্র ও আচরণের উপর প্রভাব সৃষ্টিকারী বিধর্মীদের মনগড়া
উৎসব যেমন ভালোবাসা দিবস ইত্যাদি থেকে সুরক্ষার উদ্দেশ্যে আমরা ঈদে মীলাদুন্নবী পালন
করি, এ কাজ কি বৈধ?
উত্তর:
আল-হামদুলিল্লাহ
প্রথমত:
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মতবিরোধ
রয়েছে, তবে এ ব্যাপারে তারা একমত যে, হিজরী এগারতম বছর রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমান যুগে এ মৃত্যু দিবসেই কিছু লোক মাহফিলের
আয়োজন করে 'ঈদে মীলাদুন্নবী' উদযাপন
করছে।
দ্বিতীয়ত:
ইসলামি শরী'আতে 'ঈদে মীলাদুন্নবী' নামে কোনো অনুষ্ঠান নেই। সাহাবায়ে
কেরাম, তাবে'ঈ ও কোনো ইমাম এসব অনুষ্ঠান
পালন করা তো দুরের কথা এ জাতীয় ঈদের সাথে পরিচিতও ছিলেন না। মূর্খ বাতেনী-শিয়া গ্রুপের
কতক লোক এ ঈদের সূচনা করলে কতিপয় শহরের লোকেরা এ বিদ'আতের
দিকে ধাবিত হয়।
তৃতীয়ত:
সুন্নতের কতক সত্যিকার ভক্ত নিজ দেশের এসব অনুষ্ঠান দেখে প্রভাবিত হয়,
তারা এসব বিদ'আত থেকে নিজেদের সুরক্ষার জন্য
পরিবার নিয়ে জমায়েত হয়, বিশেষ খাবারের আয়োজন করে এবং সবাই
মিলে খায়। একই উদ্দেশ্যে কেউ বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের একত্র করে, কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন চরিত আলোচনা অথবা
দীনি বক্তৃতা উপস্থাপনের জন্য লোকদের একত্র করে।
সন্দেহ
নেই এর উদ্দেশ্য আপনাদের ভালো, যেমন পরস্পরের
মাঝে ঐক্য তৈরি, অমুসলিমপ্রধান ও কুফুরী দেশে ইসলামি মূল্যবোধ
সৃষ্টি করা ইত্যাদি।
তবে
বাস্তবতা হচ্ছে: আপনাদের এসব ভালো উদ্দেশ্য কোনো অনুষ্ঠানকে বৈধতার সনদ দেয় না;
বরং এসব ঘৃণিত বিদ'আত। আপনাদের ঈদের প্রয়োজন
হলে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহাই যথেষ্ট, আরও ঈদের প্রয়োজন হলে
আমাদের সাপ্তাহিক ঈদ জুমু'আর দিন পালন করুন, এতে আপনারা জুমু'আর সালাত ও দীনের মূল্যবোধ তৈরির
জন্য একত্র হোন। এটা সম্ভব না হলে এসব বিদ'আতী অনুষ্ঠান ব্যতীত
বছরের আরও অনেক দিন রয়েছে, সেখানে বিভিন্ন বৈধ উপলক্ষে একত্র
হতে পারেন, যেমন বিয়ের অনুষ্ঠান অথবা ওলিমার দাওয়াত অথবা আকিকা
অথবা বিশেষ উপলক্ষে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ইত্যাদি। এসব অনুষ্ঠানকে আপনারা পরস্পর সম্প্রীতি
সৃষ্টি, একতার বন্ধন তৈরি ও দ্বীনের মূল্যবোধ জাগ্রত করার
ন্যায় ইত্যাদি সৎ উদ্দেশ্যে কাজে লাগাতে পারেন।
নিম্নে
ভালো নিয়তে বিদ'আতি অনুষ্ঠানে যোগদান
সম্পর্কে আলেমদের ফতোয়া উল্লেখ করছি:
এক.
ইমাম আবু হাফস তাজুদ্দিন আল-ফাকেহানী রহ. মিলাদের বিভিন্ন প্রকার সম্পর্কে বলেন: “কোনো ব্যক্তির নিজ অর্থায়নে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব
ও সন্তানদের জন্য মাহফিলের আয়োজন করা, শুধু পানাহারের মধ্যে
সীমাবদ্ধ থাকা এবং পাপের কোনো সুযোগ না রাখা, এসব অনুষ্ঠানকেই
আমরা বিদ'আত, ঘৃণিত ও মাকরূহ বলছি।
কারণ, এ ধরণের অনুষ্ঠান আমাদের কোনো মনীষী করেন নি,
যারা ছিল ইসলামের পণ্ডিত, যুগ শ্রেষ্ঠ আলেম,
যুগের আলোকবর্তিকা ও জগতবাসীর উজ্জ্বল নক্ষত্র।" (দেখুন: 'আল-মাওরেদ ফি আমালিল মাওলিদ' পৃষ্ঠা: ৫)
দুই.
ইবনুল হাজ আল-মালেকী রহ. গান-বাজনা ও নারী-পুরুষের সহাবস্থান মুক্ত ঈদে মীলাদুন্নবী
সম্পর্কে বলেন: “ঈদে মীলাদুন্নবী যদি
এসব পাপাচার মুক্ত শুধু খানার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে উদযাপন করা হয় এবং তাতে বন্ধু-বান্ধবদের
আহ্বান করা হয়, তাহলেও শুধু নিয়তের কারণে এ অনুষ্ঠান বিদ'আত হিসেবে গণ্য হবে। কারণ, এটা দীনের মধ্যে সংযোজনের
শামিল, পূর্বসূরিদের আমল বিরোধী এবং তাদের নিয়ত ও কর্মের বিপরীত।
আমাদের তুলনায় তাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য,
সম্মান ও মহব্বত বেশি ছিল। দীনি বিষয়ে তারা ছিলেন আমাদের চেয়ে অগ্রগামী।
তাদের কেউ মীলাদের নিয়ত করেন নি। আমরা তাদের অনুসারী, অতএব
তাদের জন্য যা যথেষ্ট, আমাদের জন্যও তাই যথেষ্ট। মৌলিক ও পূর্বাপর
সকল বিষয়েই তারা আমাদের আদর্শ ও পথিকৃৎ। ইমাম আবু তালেব আল-মাক্কী রহ. তার কিতাবে অনুরূপই
বলেছেন"। (দেখুন: আল-মাদখাল ২/১০)
তিনি
আরও বলেন: কেউ কেউ এসব হারাম গান-বাদ্যের পরিবর্তে 'বুখারী খতম' দ্বারা ঈদে মীলাদুন্নবী পালন করে।
সন্দেহ নেই হাদীসের দরস ইবাদাত ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম, এতে রয়েছে বরকত ও কল্যাণ; কিন্তু এসব হাসিল করার
জন্য শরী'আত অনুমোদিত পন্থা অবলম্বন করা জরুরি, মিলাদের উদ্দেশ্যে তা পাঠ করা নয়, যেমন সালাত আল্লাহর
বিশেষ ইবাদাত, তবুও অসময়ে এ সালাত পড়া নিন্দনীয়, সালাতের এ অবস্থা হলে অন্যান্য ইবাদাতের অবস্থা কি হবে?! (দেখুন: আল-মাদখাল ২/২৫)
মোদ্দাকথা:
এসব মৌসুমে আপনাদের উল্লিখিত সৎ উদ্দেশ্যে, যেমন পরস্পর একতা তৈরি, উপদেশ ও নসিহত প্রদান ইত্যাদি
নিয়তে, জমা হওয়া বৈধ নয়; বরং এসব
উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্য অন্য কোনো উপলক্ষ বেছে নিন, পুরো বছরের যে কোনো একটি দিন নির্ধারণ করুন। দো'আ করছি আল্লাহ আপনাদের কল্যাণের চেষ্টা করার তাওফীক দান করুন এবং আপনাদের
হিদায়াত ও তাওফীক বৃদ্ধি করুন। আল্লাহ ভালো জানেন।
সমাপ্ত
গান-বাজনার
ব্যাপারে
ইসলামের
বিধান ()
-আখতারুজ্জামান মুহাম্মদ সুলাইমান
প্রবন্ধটিতে
গান-বাজনার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সবিস্তারে আলোকপাত করা হয়েছে। বর্তমান যুগের
গান-বাজনায় যে ধরনের ফাহেশা, অশ্লীলতা, বেলেল্লাপনা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে তা
যে কোনো বিবেকবান মানুষকে উৎকণ্ঠিত করতে বাধ্য। গান-বাজনা নারীদের জন্য অধিক
ফিতনার কারণ, এ বিষয়টিও আলোচনায় স্থান পেয়েছে।
গান-বাজনার
ব্যাপারে ইসলামের বিধান
আখতারুজ্জামান
মুহাম্মাদ সুলাইমান
সম্পাদনা
: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
حكم الغناء في الإسلام
(باللغة البنغالية)
أختر الزمان محمد سليمان
مراجعة: د/ أبو بكر محمد زكريا
সূচিপত্র
১. গান-বাজনার ক্ষতিকর দিকসমূহ. 4
২. শরীরে লোহা প্রবেশ করানোর হাকীকত.. 7
৩. বর্তমান জামানায় গান-বাজনা.. 11
৪. তথাকথিত ধর্মীয় গান. 12
৫. শ্রুতিমধুর কন্ঠস্বরের দ্বারা মেয়েদের ফিৎনা.. 13
৬. গান অন্তরে নিফাকী সৃষ্টি করে... 14
৭. গান-বাজনা শ্রবণের প্রতিকার. 16
৮. যে সকল গান শ্রবণ করা জায়েয. 18
সংক্ষিপ্ত
বর্ণনা.............
প্রবন্ধটিতে
গান-বাজনার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সবিস্তারে আলোকপাত করা হয়েছে। বর্তমান যুগের
গান-বাজনায় যে ধরনের ফাহেশা, অশ্লীলতা,
বেলেল্লাপনা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে তা যে কোনো বিবেকবান মানুষকে
উৎকণ্ঠিত করতে বাধ্য। গান-বাজনা নারীদের জন্য অধিক ফিতনার কারণ, এ বিষয়টিও আলোচনায় স্থান পেয়েছে।
গান-বাজনার
ব্যাপারে ইসলামের বিধান
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন:
﴿وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَشۡتَرِي لَهۡوَ ٱلۡحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ بِغَيۡرِ عِلۡمٖ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًاۚ﴾ [لقمان: ٦]
“আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে
বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে। আর তারা ঐগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে
গ্রহণ করে।” [সূরা লুকমান, আয়াত: ৬]
বেশিরভাগ
মুফাস্সীরগণ বলেন, আল্লাহ তা‘আলা لَهۡوَ ٱلۡحَدِيثِ বলতে গানকে বুঝিয়েছেন। ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, তা হচ্ছে গান। ইমাম হাসান বসরী রহ.
বলেন, তা গান ও বাদ্যের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে।
আল্লাহ
তা‘আলা শয়তানকে সম্বোধন করে বলেন,
﴿وَٱسۡتَفۡزِزۡ مَنِ ٱسۡتَطَعۡتَ مِنۡهُم بِصَوۡتِكَ﴾ [الاسراء: ٦٤]
“তোমার কন্ঠ দিয়ে তাদের মধ্যে যাকে পারো প্ররোচিত কর।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৬৪]
গান-বাজনার
ক্ষতিকর দিকসমূহ:
ইসলাম
কোনো জিনিসের মধ্যে ক্ষতিকারক কোনো কিছু না থাকলে তাকে হারাম করে নি। গান ও বাজনার
মধ্যে নানা ধরনের ক্ষতিকর জিনিস রয়েছে। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া রহ. এ সম্বন্ধে
বলেন,
- বাজনা হচ্ছে নফসের মদস্বরূপ। মদ যেমন মানুষের ক্ষতি করে, বাদ্যও মানুষের সেই রকম ক্ষতি করে। যখন গান-বাজনা তাদের আচ্ছন্ন করে
ফেলে, তখনই তারা শির্কে পতিত হয়। আর তখন তারা ফাহেশা কাজ
ও যুলুম করতে উদ্যত হয়। তারা শির্ক করতে থাকে এবং যাদের কতল করা নিষেধ তাদেরকেও
কতল করতে থাকে। যিনা করতে থাকে। যারা গান-বাজনা করে তাদের বেশিরভাগের মধ্যেই এই
তিনটি দোষ দেখা যায়। তাদের বেশিরভাগই মুখ দিয়ে শিস দেয় ও হাততালি দেয়।
- শির্কের
নিদর্শন: তাদের
বেশির ভাগই তাদের শাইখ (পীর) অথবা
গায়কদের আল্লাহরই মতোই ভালোবাসে অথবা আরো অধিক।
- অশ্লীলতা: গান হলো যিনার
রাস্তাস্বরূপ। এর কারণেই গানের মজলিসে বেশিরভাগ ফাহেশা তথা অশ্লীল কাজ অনুষ্ঠিত
হয়। ষেখানে পুরুষ, বালক, বালিকা ও মহিলা চরম স্বধীন ও লজ্জাহীন হয়ে পড়ে। এভাবে গান শ্রবণ করতে
করতে নিজেদের ক্ষতি ডেকে আনে। তখন তাদের জন্য ফাহেশা কাজ করা সহজ হয়ে দাঁড়ায়,
যা মদ্যপানের সমতুল্য কিংবা আরও অধিক।
- কতল বা হত্যা: অনেক সময় গান
শ্রবণ করতে করতে উত্তেজিত হয়ে একে অপরকে হত্যা করে ফেলে। তখন বলে: তার মধ্যে এমন
অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল, যে জন্য হত্যা করা
ছাড়া উপায় ছিল না। তা থেকে বিরত থাকা তার ক্ষমতার বাইরে ছিল। আসলে এ সময়ে মজলিসে
শয়তান উপস্থিত হয়। আর যাদের ওপর শয়তান বেশি শক্তিশালী তারা অন্যদের হত্যা করে
ফেলে।
- পথভ্রষ্টতা ও
ক্ষতি: গান-বাজনা
শ্রবণে অন্তরের কোনো লাভ হয় না, তাতে
কোনো উপকারও নেই; বরঞ্চ এতে আছে গোমরাহী এবং ক্ষতি,
যা লাভের থেকেও বেশি ক্ষতিকর। যা রূহের জন্য ঐ রকম ক্ষতিকর যেমন
মদ শরীরের জন্য ক্ষতিকর। ফলে যারা সঙ্গীত শ্রবণ করে, তাদের
নেশা মদ্যপায়ীর নেশা থেকেও অনেক বেশি হয়। তারা ওতে যে মজা পায়, তা মদ্যপায়ীর থেকেও অনেক বেশি।
- শয়তান তাদের
নিয়ে খেলা করে: তখন
এই অবস্থায় তারা আগুনে প্রবেশ করে, কেউ গরম লোহা শরীরের মধ্যে কিংবা জিহ্বায় প্রবেশ করায় অথবা এ জাতীয় কাজ
করে। তারা সালাত আদায়ের সময় অথবা কুরআন তিলাওয়াতের সময় এই রকম অবস্থা প্রাপ্ত হয়
না। কারণ এগুলো শরী‘আতসম্মত ইবাদত, ঈমানী কাজ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের কাজ, যা শয়তানকে দূরে সরিয়ে দেয়। আর
অন্যগুলো ইবাদতের নামে বিদ‘আত। এতে আছে শির্ক ও শয়তানী
কাজ, দার্শনিকের কাজ। যাতে শয়তানরা সহজেই আকৃষ্ট হয়।
শরীরে
লোহা প্রবেশ করানোর হাকীকত:
শরীরের
মধ্যে লোহার শলাকা, না রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আর না সাহাবীগণ প্রবেশ করাতেন। যদি এ কাজ উত্তমই হত তবে অবশ্যই
তারা এতে অগ্রগামী হতেন। বরঞ্চ উহা সূফী পীর ও বিদ‘আতীদের কাজ। আমি তাদেরকে মসজিদে একত্রিত হতে দেখেছি। তাদের সাথে তবলা
জাতীয় যন্ত্র দফ ছিল। তারা গান করছিল: আমাদের মদের গ্লাস এনে দাও এবং তা আমাদের পান করাও। আল্লাহর
ঘরে বসে মদ জাতীয় দ্রব্যের উচ্চারণ করতে তাদের লজ্জাও হয় না। তারপর উচ্চ আওয়াজে দফ
বাজাচ্ছিল এবং উচ্চ আওয়াজে গাইরুল্লাহর নিকট বিপদে উদ্ধার চাচ্ছিল। আর বলছিল: হে
দাদা! ... এভাবে শয়তান তাদের ধোকায় নিপতিত করছিল। তারপর আর একজন তার জামা খুলে
একটি লোহার শিক হাতে নিয়ে তার পাঁজরের মধ্যে প্রবেশ করাল। তারপর আর একজন উঠে
দাঁড়িয়ে কাঁচের একটি গ্লাস ভেঙ্গে তা দাঁত দিয়ে চুর্ণ বিচুর্ণ করছিল। তখন আমি মনে
মনে বললাম, এরা যা বলছে তা যদি সত্যিই সহীহ হয় তবে যেন
তারা ঐ ইয়াহূদীদের সাথে যুদ্ধ করে যারা আমাদের ভূমি জবর দখল করে রেখেছে আর আমাদের
সন্তানদের হত্যা করেছে। এসব কাজ যে সব শয়তানরা সেখানে উপস্থিত হয় তারা তাদের
সাহায্য করে। কারণ, ঐ লোকেরা আল্লাহর স্মরণ হতে দূরে
রয়েছে। আর যখন তারা তাদের পূর্ব পুরুষদের নিকট বিপদে উদ্ধার চায়, তখন তারা শির্কের মধ্যে লিপ্ত হয়। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَمَن يَعۡشُ عَن ذِكۡرِ ٱلرَّحۡمَٰنِ نُقَيِّضۡ لَهُۥ شَيۡطَٰنٗا فَهُوَ لَهُۥ قَرِينٞ ٣٦ وَإِنَّهُمۡ لَيَصُدُّونَهُمۡ عَنِ ٱلسَّبِيلِ وَيَحۡسَبُونَ أَنَّهُم مُّهۡتَدُونَ ٣٧﴾ [الزخرف: ٣٦، ٣٧]
“আর যে পরম করুণাময়ের যিকির থেকে বিমুখ থাকে, আমরা
তার জন্য এক শয়তানকে নিয়োজিত করি, ফলে সে এক শয়তানের
সঙ্গী হয়ে যায়। আর নিশ্চয় তারাই (শয়তান) মানুষদেরকে
আল্লাহর পথ থেকে বাধা দেয়। অথচ মানুষ মনে করে তারা হিদায়াতপ্রাপ্ত।” [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৩৬-৩৭]
আল্লাহ
তা‘আলা তাদের জন্য শয়তানকে নির্দিষ্ট করে দেন,
যাতে তারা আরও গোমরাহ হতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ قُلۡ مَن كَانَ فِي ٱلضَّلَٰلَةِ فَلۡيَمۡدُدۡ لَهُ ٱلرَّحۡمَٰنُ مَدًّاۚ﴾ [مريم: ٧٥]
“বলুন, যে বিভ্রান্তিতে রয়েছে তাকে পরম করূণাময়
প্রচুর অবকাশ দিবেন।” [সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৭৫]
শয়তান
যে তাদের সাহায্য করে, এতে আবাক হওয়ার
কিছুই নেই। কারণ, সুলাইমান আলাইহিস সালাম রাণী বিলকীসের
সিংহাসন উঠিয়ে আনার জন্য এক জিন্নের নিকট সাহায্য চেয়েছিলেন। এ সম্বন্ধে কুরআনে
আছে,
﴿ قَالَ عِفۡرِيتٞ مِّنَ ٱلۡجِنِّ أَنَا۠ ءَاتِيكَ بِهِۦ قَبۡلَ أَن تَقُومَ مِن مَّقَامِكَۖ وَإِنِّي عَلَيۡهِ لَقَوِيٌّ أَمِينٞ ٣٩ ﴾ [النمل: ٣٩]
“এক শক্তিশালী জিন্ন বলল, আপনি আপনার স্থান
থেকে উঠার পূর্বেই আমি তা এনে দিব। আমি নিশ্চয় এ ব্যাপারে শক্তিশালী ও আমানতদার।” [সূরা আন-নামল, আয়াত: ৩৯]
যারা
হিন্দুস্তানে গিয়েছেন, যেমন ভ্রমনবিদ ইবন
বতুতা কিংবা অন্যান্যরা। তারা অগ্নি উপাসকদের লোহার শিক শরীরে প্রবেশ করানো থেকেও
বেশি ভয়ংকর ঘটনা দেখেছে, যদিও তারা ছিল কাফের। তাই এ ঘটনা
কোনো কারামত বা অলৌকিক ঘটনা নয়। বরঞ্চ তা ঐ সমস্ত শয়তানদের ঘটনা যারা এভাবে
একত্রিত হয় গান বাজনার আসরে। দেখা যায়, বেশিরভাগ লোক যারা
শরীরে শিক প্রবেশ করায়, তারা নানা ধরনের পাপে লিপ্ত।
এমনকি প্রকাশ্যভাবে তারা আল্লাহর সাথে শির্কে লিপ্ত থাকে। কারণ, তারা তাদের মৃত পুর্বপুরুষদের নিকট সাহায্য ভিক্ষা করে। তাহলে কীভাবে
কারামতের অধিকারী অলী আল্লাহ হতে পারে?
আল্লাহ
তা‘আলা ওলীদের সম্বন্ধে বলেন:
﴿أَلَآ إِنَّ أَوۡلِيَآءَ ٱللَّهِ لَا خَوۡفٌ عَلَيۡهِمۡ وَلَا هُمۡ يَحۡزَنُونَ ٦٢﴾ [يونس: ٦٢]
“শুনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয়
নেই, আর তারা পেরেশানও হবে না। [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৬২]
অলী
হচ্ছেন ঐ মুমিন বান্দা, যিনি সর্বদা এক
আল্লাহর নিকট সাহায্য ভিক্ষা করেন। আর মুত্তাকি হচ্ছেন ঐ ব্যক্তি যিনি আল্লাহর
সাথে পাপ ও শির্ক করা থেকে বিরত থাকেন। এ সমস্ত অলীদের জীবনে হঠাৎ করে কোনো কারামত
ঘটে যায়। আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মানুষের দাবী বা লোক দেখানোর জন্য এটা ঘটে না।
বর্তমান
জামানায় গান-বাজনা:
বর্তমান
জামানায় বেশিরভাগ গান হয় বিয়ের মজলিসে অথবা অন্য কোনো উৎসবে,
রেডিও ও টেলিভিশনে। এগুলোর বেশিরভাগই ভালোবাসা, মিলনাকাংখা, চুমু, দেখা-সাক্ষাৎ
ইত্যাদির ওপরে ভিত্তি করে রচিত। তাতে থাকে মুখের, কপালের
এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রতঙ্গের বর্ণনা, যা যুবকদের
মনে মিলনাকাংখা জাগিয়ে তোলে আর তাদের অশ্লীল কাজ ও যিনা করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং
তাদের চরিত্র নষ্ট করে।
যখন
গায়ক গায়িকারা গান বাজনার নামে একত্রিত হয়, তখন ঐ সমস্ত ধন দৌলত ব্যয় হয়, যা সংস্কৃতির
নামে জাতীয় তহবিল থেকে চুরি করা হয়। তারপর ঐ ধন দৌলত নিয়ে ইউরোপ আমেরিকা গিয়ে
বাড়ি-গাড়ী ইত্যাদি খরিদ করে। তারা তাদের অশ্লীল গান-বাজনা দিয়ে জাতীয় চরিত্র নষ্ট
করে দেয়। তাদের অশ্লীল ও নগ্ন ছবি দিয়ে যুবকদের চরিত্র নষ্ট করে। ফলে আল্লাহকে
ছেড়ে তারা তাদেরকে ভালোবাসতে থাকে। এমনকি ১৯৬৭ সালে ইয়াহূদীদের সাথে যুদ্ধের সময়
রেডিও হতে বলা হচ্ছিল, তোমরা যুদ্ধে অগ্রসর হতে থাক;
কারণ তোমাদের সাথে অমুক অমুক গায়িকা আছে। ফলে তারা পাপিষ্ট
ইয়াহূদীদের সাথে চরমভাবে বিপর্যস্ত ও পরাজিত হয়। বরঞ্চ তাদের বলা উচিৎ ছিল,
তোমরা আল্লাহর সাহায্য নিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হতে থাক, তিনি তোমাদের সাথে আছেন। এমনকি এক গায়িকা এ ঘোষণা দিয়েছিল যে, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পূর্বে তার প্রতি মাসে কায়রোয় যে মাসিক উৎসব হতো,
এ বৎসর তা সে তেলআবিবে করবে, যদি তারা
জয়যুক্ত হয়। অন্যদিকে আল্লাহর সাহায্যের জন্য ইয়াহূদীরা যুদ্ধের পর বায়তুল
মুকাদ্দাসের গোনাহ মোচনের দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছিল।
তথাকথিত
ধর্মীয় গান:
এসব
ধর্মীয় গান-বাজনার মধ্যেও নানা ধরনের গর্হিত কথা থাকে। যেমন বলা হলো,
প্রতি নবীরই একটা নির্দিষ্ট অবস্থান আছে, আর হে মুহাম্মাদ! এ সেই ‘আরশ! একে গ্রহণ কর।
এই বাক্যের শেষ কথা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নামে মিথ্যা বানান হয়েছে, যার মূল ঠিক নয়। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনই ‘আরশ গ্রহণ করবেন না আর তাঁর রবও
এ কথা বলবেন না।
শ্রুতিমধুর
কন্ঠস্বরের দ্বারা মেয়েদের ফিৎনা:
সাহাবী
বারা ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর
কন্ঠস্বর ছিল মধুর। কোনো কোনো সফরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের
সাথে চলার সময় ধর্মীয় গান গাইতেন। একদা যখন তিনি গান গাচ্ছিলেন, আর মহিলারা নিকটে এসে পড়ল, তখন রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে
বললেন: মেয়েদের
থেকে সাবধান! ফলে তিনি নিশ্চুপ হয়ে পড়লেন। তার স্বর মেয়েরা শ্রবণ করুক তা রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পছন্দ করেন নি। (হাকেম, হাদীস নং ৫২৭৩)
যদি
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ভয় পেয়ে থাকেন যে,
বাগানে গিয়ে সুর করে কবিতা পড়লে মেয়েদের মধ্যে ফিৎনা হবে,
তাহলে বর্তমান জামানায় মহিলারা রেডিও টেলিভিশনে যে ধরনের
গান-বাজনা করে তাদের গান-বাজনা শুনলে কী বলতেন? এ ধরনের
গায়িকারা বেশিরভাগই নানা ধরনের ফাসিক ও নগ্ন কার্যকলাপে লিপ্ত থাকে, আর শরীরের নানাবিধ বর্ণনা দিয়ে যে কবিতা পাঠ করে তাতে বিবিধ ধরনের
অব্স্থার ও মানসিক ফিতনার উদ্রেক করে। ফলে অন্তরে এমন রোগের সৃষ্টি হয় যা তাদের
তাদের লজ্জা শরম বির্সজন দিতে ও বেহায়াপনায় লিপ্ত হতে উৎসাহিত করে। যদি এ গানের
সাথে মাতাল করা সুরের মিশ্রণ হয়, তবে তো তাদের বুদ্ধির
বিভ্রম ঘটায়। যারা এই গানের নেশায় পড়ে, তাদের তা ঐ রকমই
ক্ষতি করে যা মদ পান করার পর হয়ে থাকে।
গান
অন্তরে নিফাকী সৃষ্টি করে:
ইবন
মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, গান অন্তরে মুনাফেকী সৃষ্টি করে, যেমন পানি
ঘাস সৃষ্টি করে। যিকির অন্তরে ঈমান সৃষ্টি করে, যেমন পানি
ফসল উৎপন্ন করে।
ইবনুল
কাইয়্যেম রহ. বলেন, যে ব্যক্তি সব সময়
গান-বাজনায় ব্যস্ত থাকে, তার অন্তরে মুনাফেকীও সৃষ্টি হবে,
যদিও তার মধ্যে এর অনুভুতি আসবে না। যদি সে মুনাফেকীর হাকীকত
বুঝতে পারত, তবে অবশ্যই অন্তরে তার প্রতিফলন দেখতে পেত।
কারণ, কোনো বান্দার অন্তরে কোনো অবস্থাতেই গানের মহব্বত ও
কুরআনের মহব্বত একত্রে সন্নিবেশিত হতে পারে না। তাদের একটি অন্যটিকে অবশ্যই দুর
করে দিবে। কারণ, আমরা দেখতে পাই যে, গান ও কাওয়ালী শ্রবণকারীদের কাছে কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করা খুবই শক্ত
ঠেকে আর ক্বারীগণ যে আয়াতই তিলাওয়াত করুক না কেন, তা
দ্বারা ঐসব লোক মোটেই উপকৃত হয় না। ফলে শরীরে কোনো নাড়াচড়া ও অন্তরে কোনো উদ্দীপনা
আসে না। আর যখনই তারা গান শ্রবণ করে, তখনই তাদের
কন্ঠস্বরে ভয়ের এক প্রভাব সৃষ্টি হয়, অন্তরে এক ভাবের
সৃষ্টি হয়, সেটার জন্য রাত্রি জাগরণ করা তাদের নিকট মধুর
হয়। ফলে দেখতে পাই তারা গান বাদ্য শ্রবণ করাকে কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ অপেক্ষা বেশি
প্রধান্য দেয়। বেশিরভাগ লোকই যারা গান ও বাদ্যের ফিৎনায় লিপ্ত আছে, তারা সালাত আদায়ে খুব অলসতা দেখায়। বিশেষ করে জামা‘আতে সালাত আদায়ের ব্যাপারে।
ইবন
আকীল রহ. যিনি হাম্বলী মাযহাবের একজন বড় আলেম, তিনি বলেন, যদি কোনো গায়িকা (নিজের স্ত্রী
ব্যতিত) গান
গায় তবে তা শ্রবণ করা হারাম। এ ব্যপারে হাম্বলী মাযহাবে কোনো মতবিরোধ নেই।
ইবন
হাযম রহ. বলেন, মুসলিমদের জন্য
কোনো বেগানা মহিলার গান শ্রবণ করে আনন্দ লাভ করা হারাম।
গান-বাজনা
শ্রবণের প্রতিকার:
রেডিও
টেলিভিশন, ভিডিও কিংবা অন্য কোনো স্থানে যে গান হয়,
তা শ্রবণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে অশ্লীল গান থেকে,
যাতে বাদ্যও বাজানো হয়।
গান-বাজনা
থেকে বিপরীত কাজ হলো আল্লাহর যিকির ও কুরআন তিলাওয়াত করা। বিশেষ করে সূরা
আল-বাকারাহ তিলাওয়াত করা।
রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«إنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الذِيْ يَقْرَأُ فِيْهِ الْبَقَرَةَ»
“যে বাড়িতে সূরা আল-বাকারাহ তিলাওয়াত করা হয়, সে
বাড়ি থেকে শয়তান পালায়ন করে।”[1]
আল্লাহ
তা‘আলা বলেন:
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ قَدۡ جَآءَتۡكُم مَّوۡعِظَةٞ مِّن رَّبِّكُمۡ وَشِفَآءٞ لِّمَا فِي ٱلصُّدُورِ وَهُدٗى وَرَحۡمَةٞ لِّلۡمُؤۡمِنِينَ ٥٧﴾ [يونس: ٥٧]
“হে মানুষ, তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদেরর
কাছে এসেছে উপদেশ এবং অন্তরসমূহে যা থাকে তার শিফা আর মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও
রহমত। [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৫৭]
রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী ও শামায়েল (আখলাক) পাঠ
করা এবং সাথে সাথে সাহাবায়ে কেরামের জীবনীও অধ্যায়ন করা।
যে
সকল গান শ্রবণ করা জায়েয:
ঈদের
গান শ্রবণ করা: এ হাদীসটি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত:
«دَخَلَ رَسُولُ اللهِ صَلي الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَيْهَا وَعِنْدَهَا جَارِيَتَانِ تَضْرِبَانِ بِدَفَّيْنِ (وَفِي رِوَايَةٍ عِنْدِي جَارِيَتَانِ تُغَنِّيَانِ) فَانْتَهَرَهُمَا ابُوْبَكرٍ فَقالَ صَلي الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَعْهُنَّ فَانَّ لِكُلِّ قَوْمٍ عِيْدًا وَإنَّ عِيْدَنَا هَذا الْيَوْم» (رواه البخاري)
“একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ঘরে প্রবেশ
করেন। তখন তাঁর ঘরে দুই বালিকা দফ বাজাচ্ছিল। অন্য রেওয়ায়েতে আছে গান করছিল। আবু
বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তাদের ধমক দেন। তখন রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তাদের গাইতে দাও। কারণ, প্রত্যেক জাতিরই ঈদের দিন আছে। আর আমাদের ঈদ হল আজকের দিন।”[2]
দফ
বাজিয়ে বিয়ে প্রচারের জন্য গান গাওয়া আর তাতে মানুষদের উদ্ধুদ্ধ করা। দলীল: রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«فَصْلُ ما بَيْنَ الْحَلَالِ وَالْحَرَمِ ضَرْبُ الدَّفِ وَالصَّوْتُ فِي النِّكَاحِ»
“বিয়ে হারাম বা হালাল হওয়ার মধ্যে পার্থক্য হলো দফের বাজনা ও শব্দ করে
জানিয়ে দেওয়া।”[3] যাতে এর দ্বারা
বুঝা যায় যে, সেখানে বিয়ে
অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
কাজ
করার সময় ইসলামী কোরাস শ্রবণ করা, যাতে
কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ঐ গানে যদি দো‘আ থাকে।
এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত ইবন রাওয়াহা
রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু নামক সাহাবীর কবিতা আবৃত্তি করতেন। আর
সাথীদেরকে খন্দকের যুদ্ধের সময় পরিখা খনন করতে উদ্ধুদ্ধ করতেন এই বলে যে, “হে আল্লাহ কোনোই
জীবন নেই আখেরাতের জীবন ব্যতীত। তাই আনসার ও মুহাজিরদের ক্ষমা করে দিন। তখন আনছার
ও মুহাজিনগণ উত্তর দিলেন: আমরাই হচ্ছি ঐ ব্যক্তিবর্গ যারা রাসূলের নিকট বাই‘আত করেছি জিহাদের জন্য, সর্বদাই যতদিন আমরা
জীবিত থাকি।”
আর
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণকে নিয়ে যখন খন্দক (গর্ত) খনন করছিলেন, তখন ইবন
রাওয়াহা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এ কবিতা
আবৃত্তি করছিলেন:
“আল্লাহর কসম! যদি আল্লাহ না করতেন তাহলে আমরা হিদায়াত পেতাম না। আর
সিয়ামও পালন করতাম না, আর সালাতও আদায় করতাম না। তাই
আমাদের ওপর সাকিনা (শান্তি) নাযিল
করুন। আর যখন শত্রুদের মুকাবিলা করব তখন আমাদের মজবুত রাখুন। মুশরিকরা আমাদের ওপর
আক্রমণ করেছে আর যদি তারা কোনো ফিৎনা সৃষ্টি করে, তবে আমরা তা ঠেকাবই।” বারে বারে আবাইনা শব্দটি তারা উচ্চ স্বরে উচ্চারণ করছিলেন।
ঐ
সমস্ত কবিতা-গান, যাতে আল্লাহর
তাওহীদের কথা আছে অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহব্বত ও তার
শামায়েল আছে অথবা যাতে জিহাদে উৎসাহিত করা হয় তাতে দৃঢ় থাকতে অথবা চরিত্রকে দৃঢ়
করতে উদ্ধুদ্ধ করা হয় অথবা এমন দাওয়াত দেওয়া হয় যাতে মুসলিমদের একে অন্যের প্রতি
মহব্বত ও সম্পর্ক সৃষ্টি হয় অথবা যাতে ইসলামের মৌলিক নীতি বা সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা
হয় অথবা এই জাতীয় অন্যান্য কথা যা সমাজকে উপকৃত করে দীনি আমলের দিকে কিংবা চরিত্র
গঠনের জন্য উৎসাহ প্রদান করে।
ঈদের
সময় ও বিয়ের সময় কেবল মহিলাদের জন্য তাদের নিজেদের মধ্যে দফ বাজানোর অনুমতি ইসলাম
দিয়েছে। যিকিরের সময় এটার ব্যবহার ইসলাম কখনই দেয় নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিকিরের সময় কখনই তা ব্যবহার করেন নি। তাঁর পরে তাঁর সাহাবায়ে
কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম কখনই তা করেন নি। অথচ ভণ্ড সুফি পীররা তা মুবাহ করেছে
নিজেদের জন্য। আর যিকিরের দফ বাজানকে তারা সুন্নাত বানিয়ে নিয়েছে। বস্তুত তা বিদ‘আত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«ايَّاكُمْ وَمُحْدَثاتِ الْاُمُوْرِ فاِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بدْعَةٍ وكُلُّ بِدْعًةٍ ضَلالَةٍ»
“তোমরা দীনের মধ্যে নতুন কোনো সংযোজন করা হতে বিরত থাকো। কারণ, প্রতিটি নতুন সংযোজনই বিদ‘আত। আর প্রতিটি বিদ‘আতই গোমরাহী।”[4]
সমাপ্ত
[1] সহীহ মুসলিম,
হাদীস নং ৭৮০।
[2] সহীহ বুখারী,
হাদীস নং ৩৯৩১।
[3] মুসনাদে আহমাদ,
হাদীস নং ১৫৫৪১।
[4] আবূ দাঊদ,
হাদীস নং ৪৬০৭; মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১৭১৪৫।
--------
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
গান-বাদ্য ও এর কুপ্রভাব
[বাংলা - bengali - البنغالية]
লেখক: আলী হাসান তৈয়ব
সম্পাদনা :
ড. মোঃ আবদুল কাদের
2011- 1432
﴿ الأغاني والموسيقى وآثارها السيئة ﴾
« باللغة البنغالية »
علي حسن طيب
مراجعة: د. محمد عبد القادر
2011- 1432
গান-বাদ্য ও এর সামাজিক কুপ্রভাব
আলী হাসান তৈয়ব
গত কয়েক বছরে নাচ-গানের চর্চা অকল্পনীয় মাত্রায় বেড়েছে। দেশে যেখানে
শিক্ষা-গবেষণা ও সুনাগরিক তৈরিতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই, পর্যাপ্ত
বিনিয়োগ নেই, সেখানে চরিত্রবিধ্বংসী নাচ-গানের পেছনে অনুদান বা বিনিয়োগ তথা
আগ্রহের অন্ত নেই। যেখানে রোজই চিকিৎসার অর্থ না পেয়ে মৃত্যুর জন্য প্রহরগোনা
অসহায় মানুষের করুণ মুখ পত্রিকায় ছাপা হয় সেখানেই বহুজাতিক কোম্পানি ও বড় বড়
ব্যবসায়িক ইন্ডাস্ট্রিগুলো তাদের উপার্জিত অর্থের অনেকটাই ঢালে নৃত্য ও সঙ্গীতের
পেছনে! এখনো যেখানে বিরাটসংখ্যক মানুষের
বাস দারিদ্রসীমার নিচে, আজো যারা পেটের আগুন নেভাতে গিয়ে নিজের ঈমান পর্যন্ত বিকিয়ে
দিতে বাধ্য হয়, সেখানকারই একশ্রেণীর নাগরিক নির্দ্বিধায় পঞ্চাশ হাজার টাকায়
কেনে এক সন্ধ্যার কনসার্টের টিকেট! যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক নয়, সেখানে আবার
অনেক কিন্ডারগার্টেনে নিষ্পাপ শিশুদের নৃত্য ও সঙ্গীত শেখা বাধ্যতামূলক! আমরা যে
আজ নাচ-গানে কতটা মেতেছে তা প্রমাণে বোধ হয় আর কিছু বলার দরকার নাই। তারপরও
খানেকটা ইঙ্গিত দেয়া যাক।
আসলে বাঙের ছাতার মতো যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা টিভি চ্যালেনগুলোই
নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়াতে নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে নেমেছে মুসলিম সমাজকে গানে
মাতাল বানাতে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে নীতি ও
আদর্শ বিবর্জিত মুনাফাগৃধ্নু ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলো। ‘ক্লোজ আপ
নাম্বার ওয়ান’, ‘গাও বাংলাদেশ গাও’, ‘ক্ষুদে গানরাজ’, ‘নির্মাণশিল্পীদের
গান’, গার্মেন্ট
শ্রমিকদের গান’, ‘শাহরুখ খান লাইভ ইন কনসার্ট’, ‘ডেসটিনি
ট্রাইনেশন বিগ শো’ ইত্যাদি চটকদার সব শিরোনামের আড়ালেই রয়েছে এ দুই শ্রেণীর
বস্তুগত উদ্দেশ্য।
মিডিয়ার অকল্পনীয় উন্নতির সুবাদে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীই
মাতাল আজ এসব আয়োজনকে ঘিরে। দুঃখজনক সত্য হলো এসবে শুধু তরুণ প্রজন্মই মেতে নেই, মেতে আছেন
একশ্রেণীর অপরিণামদর্শী অভিভাবক মহলও। নাচ-গান শেখানোর পেছনে নিজেদের কষ্টার্জিত
অর্থ যদি তারা না ঢালেন, তবে তো নৃত্য-সঙ্গীতের স্কুলগুলো এত রমরমা ব্যবসা করতে পারে
না। ইদানীং বিশ্বে অনেক কিছু নিয়েই জরিপ চালানো হয়। নাচ-গানে বিনিয়োগ-আত্মনিয়োগ
নিয়ে যদি কোনো জরিপ পরিচালিত হয় তবে বাংলাদেশের মতো একটি গরিব দেশের নাম যে ওই
তালিকার অন্যতম শীর্ষস্থানে থাকবে তাতে
সন্দেহের কিছু নেই।
এতসব আয়োজন ও আয়োজকদের বদান্যতায় এ জাতি এতটাই মেতেছে, দারিদ্রের
কষাঘাতে জর্জর এ জাতি এতটা মাতাল হয়েছে যে ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত
নির্বিশেষ কোনো শ্রেণীর মানুষই গানের জোয়ারে গা না ভাসিয়ে বসে থাকছে না। আর সে
জোয়ারেই ভেসে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্মের নীতি-আদর্শ ও কাম্য সচ্চরিত্র। যে ইভটিজিং ও
যৌন অপরাধের ব্যাপক বৃদ্ধিতে এ দেশের চিরসবুজ শান্তির নিবাসগুলোতে জ্বলছে অশান্তির
কালো আগুন তার অনেকখানি দায় এসব নাচ-গানকেন্দ্রিক আয়োজনের। অবৈধ ভালোবাসা আর ভোগ
জীবনের আহ্বানে সদা সরব এসব গান কাউকে স্বস্তি দিচ্ছে না। বরং তরুণ প্রজন্মের
হৃদয়ে পাপের আগুনে ঘি ঢেলে দিচ্ছে।
এমন কোনো স্থান নেই যেখানে গেলে গানের আযাব থেকে সম্পূর্ণ
পরিত্রাণ মেলে। ঘরে বলেন বা বাইরে, পথে বলেন কিংবা যানবাহনে— সর্বত্র
ওই কানে অগ্নিবর্ষণকারী গানের আওয়াজ। বাসায় ঘুমিয়ে, পড়াশোনা করে এমনকি
পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করতে গিয়েও নিস্তার নেই এই গানের অশ্রাব্য আওয়াজ থেকে। ঘর
থেকে বের হলেন তো সেরেছে। কোথায় যাবেন দোকানে? সেখানেও কিন্তু গানের উপকরণের অভাব
নেই। হেঁটে পথ পাড়ি দেবেন? সেখানেও দেখবেন মোবাইলে সজোরে গান শুনতে
শুনতে কেউ না কেউ পথ চলছে। আর বাস বা যানবাহনের কথা তো বলাইবাহুল্য। বড় পরিতাপের
বিষয় হলো একমাত্র নিরাপদ স্থান আল্লাহর ঘর মসজিদেও এই অভিশপ্ত গানের আওয়াজ ইদানীং
কানে আসছে। অসচেতন কিছু মুসল্লী তাদের মোবাইলের রিংটোন হিসেবে গান
ব্যবহার করায় এমনটি হচ্ছে। একজন মুসল্লী কিভাবে
নিজের ছায়াসঙ্গী এই মোবাইল রিংটোন বানান গানকে তা কিছুতেই বোধগম্য নয়!
কেবল সংবাদ শোনা কিংবা নিছক ক্রিকেট খেলা দেখার অজুহাতে যারা
অপছন্দকে সঙ্গী করেই কদাচিৎ টিভি দেখেন, তারাও আজ বিপদে। এসবের ফাঁকে
বিজ্ঞাপনগুলোতে নাচ-গানের এমন দৃষ্টিকটু অনুপ্রবেশ থাকে যা তাদের মতো ‘স্বল্পপুঁজির’ ঈমানদারদেরও
টিভির সামনে ঘেঁষতে দ্বিধান্বিত করে।
আসলে নাচ-গানের ক্ষতিকারিতা এত বেশি যে তা নাজায়েয হওয়ার জন্য
আলাদা কোনো প্রমাণের দরকার পড়ে না। তদুপরি মহান আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লামের বহু ভাষ্য থেকে তা হারাম হওয়া প্রমাণিত। যেমন : আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন,
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ
الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا
هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ (6)
‘আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত
করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে, আর তারা ঐগুলোকে হাসি-ঠাট্টা
হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আযাব।’[1]
গান-গায়িকা এবং এর ব্যবসা ও চর্চাকে হারাম আখ্যায়িত করে তিনি
বলেন,
لاَ تَبِيعُوا الْقَيْنَاتِ وَلاَ تَشْتَرُوهُنَّ
وَلاَ تُعَلِّمُوهُنَّ وَلاَ خَيْرَ فِى تِجَارَةٍ فِيهِنَّ وَثَمَنُهُنَّ حَرَامٌ
‘তোমরা গায়িকা
(দাসী) কেনাবেচা করো না এবং তাদেরকে গান শিক্ষা দিও না। আর এসবের ব্যবসায় কোনো
কল্যাণও নেই। জেনে রেখ, এ থেকে প্রাপ্ত মূল্য হারাম।’[2]
অন্যত্র তিনি বলেন,
لَيَشْرَبَنَّ أُنَاسٌ
مِنْ أُمَّتِى الْخَمْرَ يُسَمُّونَهَا بِغَيْرِ اسْمِهَا وَتُضْرَبُ عَلَى رُءُوسِهِمُ
الْمَعَازِفُ يَخْسِفُ اللَّهُ بِهِمُ الأَرْضَ وَيَجْعَلُ مِنْهُمْ قِرَدَةً وَخَنَازِيرَ
».
‘আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। আর
তাদের মাথার ওপর বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা নারীদের গান বাজতে থাকবে। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে
মাটিতে ধ্বসিয়ে দেবেন। এবং তাদের মধ্যে অনেককে শূকর ও বাঁদর বানিয়ে দেবেন।’[3]
তিনি আরও বলেন,
لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ
يَسْتَحِلُّونَ الْحِرَ وَالْحَرِيرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ
‘আমার উম্মতের
মধ্যে এমন কিছু লোক সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল সাব্যস্ত করবে।’[4]
আরেক জায়গায় তিনি বলেন,
بَعَثَنِي اللهُ رَحْمَةً وَهَدًى لِلْعَالَمِينَ
وَبَعَثَنِي لِمَحْقِ الْمَعَازِفِ وَالْمَزَامِيرِ، وَأَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ
‘আল্লাহ তা‘আলা আমাকে
মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছেন এবং বাদ্যযন্ত্র, ক্রুশ ও জাহেলি
প্রথা অবলুপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন।’[5]
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
الْغِنَاءُ يُنْبِتُ النِّفَاقَ فِى الْقَلْبِ
كَمَا يُنْبِتُ الْمَاءُ الزَّرْعَ
‘পানি যেমন
(ভূমিতে) তৃণলতা উৎপন্ন করে তেমনি গান মানুষের অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে।’[6]
অথচ সবাই জানেন বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে মাদক ও পাপাসক্তির
ক্রমবিস্তার প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। হাজার প্রচারণা ও বিজ্ঞাপনেও নেশার ছোবল
থেকে এদের রক্ষা করা যাচ্ছে না। এদের হাতেই রোজ খুন-ধর্ষণসহ ইত্যাকার নানা অপরাধ
সংগঠিত হচ্ছে। এসব নাচ-গানে ডুবে তারা মানবজীবনের মূল লক্ষ্য হারিয়ে হতাশার রোগে
আক্রান্ত হচ্ছে। তাই দেখা যায় সুখী ও উন্নত দেশগুলোতেই আত্মহত্যার হার সবচে বেশি।
আসলে পরকাল ভাবনাই মানুষের কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষের ভেতরে
সুপ্রবৃত্তি ও সদগুণাবলি জাগিয়ে তোলে। আর নাচ-গানের মূল সাফল্যই এখানে যে তা
আখিরাত ভাবনাকে একেবারে ভুলিয়ে দেয়। মানুষের সুকুমার বৃত্তির ওপর পর্দা ফেলে
ক্ষণিকের বস্তুতে মজে রাখে।
সাহাবী ও তাবেয়ীদের
ভাষ্য অনুযায়ী গান ও বাদ্যযন্ত্র বহু গুনাহর সমষ্টি। যেমন : ক. নিফাক বা মুনাফেরির
উৎস খ. ব্যভিচারে অনুপ্রাণিতকারী গ. মস্তিষ্কের ওপর আবরণ ঘ. কুরআনের প্রতি অনীহা
সৃষ্টিকারী ঙ. আখিরাতের চিন্তা নির্মূলকারী চ. গুনাহের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টিকারী ও
ছ. জিহাদি চেতনা বিনষ্টকারী।[7]
আজ বড্ড প্রয়োজন তাই এ নাচ-গানের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করা।
মসজিদ, মাহফিলে, আলোচনার টেবিলে
এবং সব ধরনের মিডিয়াতে এ ব্যাপারে সর্বশ্রেণীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা। এ জাতির
অস্তিত্ব, সমৃদ্ধি ও মঙ্গলের স্বার্থেই তা জরুরী। হ্যা, নাচ-গান তথা অসুস্থ বিনোদনের প্রতি
মানুষকে নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি সুস্থ বিনোদনের দিকেও পথনির্দেশ করতে হবে।
বিনোদন মাধ্যমের উন্নতির যুগে মানুষের জন্য কুরআন-হাদীসের
আলোচনা, হামদ-নাত, ইসলামী সঙ্গীতও সহজলভ্য করতে হবে। এ জন্য
দরকার এসব কাজে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া। এসবের সঙ্গে জড়িতদের বুদ্ধি-পরামর্শ ও আর্থিক
সাহায্য দিয়ে এগিয়ে যেতে সাহায্য করা। কারণ, মানুষকে উত্তম বিকল্প না দেয়া পর্যন্ত
মানুষ কোনোদিন মন্দ থেকে বিরত থাকবে না। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সকলকে গান-বাদ্যের ফিতনা থেকে দূরে থাকবার এবং এসব বন্ধে
কাজ করার তাওফীক দিন। আমীন।
[1].
সূরা লুকমান, আয়াত : ০৬।
2. তিরমিযী : ১৩২৯;
ইবন মাজা : ২১৬৮।
3. বাইহাকী, সুনান : ১৭৮৪৫; ইবন মাজা :
৪০২০; ইবন হিব্বান : ৬৭৫৮।
4. বুখারী : ৫৫৯০।
5. মুসনাদ আহমদ : ২২৩৬১ ;
বাইহাকী : ৬১০৪।
6. বাইহাকী : ২১৫৩৬; ইগাছাতুল লাহফান
১/১৯৩; তাফসীরে
কুরতুবী ১৪/৫২।
7. ইগাছাতুল লাহফান ১/১৮৭।
Jahid Bin Masum gan
-Jahid Bin Masum_song
-Abumuyabiah
Comments
Post a Comment